মঙ্গলবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩

ছাতা আবিষ্কারের ঘটনা|জুতা আবিষ্কারের ইতিহাস

  ছাতা আবিষ্কারের ঘটনা



বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচার জন্য আদিম মানুষ কবে ছাতা হিসেবে কলা পাতা কি কচুর পাতা ছিড়ে ছাতা হিসেবে ব্যবহার করেছে অথবা প্রখর সূর্যালোকে ঘাসের তৈরী ক্যানপি টুপি বানিয়ে মাথায় পরেছে তার কথা আজ বলা সম্ভব নয়। ইতিহাসের সূত্র ধরে এগোলে দেখা যায় খ্রিষ্টপূর্ব ১২০০ সালে মিশরে ছাতা ব্যবহার করা হত। উজ্জ্বল চামড়া মানুষের আভিজাত্যের চিহ্ন হিসেবে ধরা হত। সাদা চামড়া যাতে আতপ তাপে বাদামী না হয়ে যায় সেজন্য ছাতা ব্যবহার করত তারা। আশেরিয়ায় শুধু মাত্র সম্রাটের ছাতা ব্যবহারের অধিকার ছিলো। সম্রাটদের মাথায় যে ছাতা ধরে রাখা হত তাকে বলা হয় প্যারাসল। আমরা বাঙালীরা আমব্রেলা মানেই ছাতা বলি, ইংরেজরা সূর্যের হাত থেকে ছায়া পেতে যে ছাতা ব্যবহার করে তাকে প্যারাসল এবং বৃষ্টির হাত থেকে ব্যবহৃত ছাতাকে আমব্রেলা বলে। পৃথিবীর অনেক স্থানেই ছাতাকে আভিজাত্যের প্রতীক ধরা হত। বার্মার আভা নগরে প্রাপ্ত প্রাচীন পুঁথিতে সম্রাট কে বর্ণনা করা হয়েছে “কিং অফ দ্যা হোয়াইট এলিফ্যান্ট” এবং “লর্ড অফ টুয়েন্টি ফোর প্যারাসল”। আফ্রিকার অনেক স্থানে এখনো ছাতাকে সামাজিক পদমর্যাদা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

সূর্যের প্রখর উত্তাপ থেকেবাঁচতে মানুষ গুহার ভেতরে, গাছের ছায়ায় আশ্রয় নিত। তারপর সে ছাতা বানানো শিখল। পৃত্থিবীর প্রথম ছাতা খুব সম্ভবত পাতা দিয়ে তৈরী ক্যানপি টুপি। বাংলা ছাতা শব্দটি এসেছে ছত্র থেকে। ইংরেজী আমব্রেলা শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দআম্ব্রা থেকে। আম্ব্রা অর্থ ছায়া। প্রাচীন গ্রীক শব্দ আম্ব্রোস থেকে এসেছে আম্ব্রা।


ছাতার আরেকটি নাম হলো বর্ষাতি। যদিও ব্যবহারিক জীবনে এই নাম ব্যবহার করা হয় না। বাংলাদেশে বিভিন্ন জায়গায় একই জিনিসের বিভিন্ন নাম প্রচলিত থাকলেও ছাতা কিন্তু সব জায়গায় ছাতা নামে পরিচিত। ছাতার বেশ কয়েকটি ইংরেজী নাম আছে। আমব্রেল্লা, প্যারাসল, ব্রোলি, প্যারাপ্লুয়ি, রেইন শেড, সান শেড, গ্যাম্প, বাম্বারশট, আম্ব্রলি। গ্রামীন বাঙালী সমাজে অবশ্য ছাতাকে ছাতি বলা হয়।



মূর্তিপূজারীদের দেবতাদের ছাতা ব্যবহার করতে দেখা যায়। প্রাচীন মিশরের দেবতাদেরও ছাতা ব্যবহারের কথা জানা যায়। দেবতা অসিরিসের ছাতা ছিলো। ভারতবর্ষে হিন্দুদের দেবতা বিষ্ণু তার পঞ্চইন্দ্রিয় ব্যবহার করে নরক থেকে বরুনের বৃষ্টিদায়ী ছাতা ফিরিয়ে আনেন। গ্রীক এবং রোমানদের দেবতা দায়ুনিসিস এবং বাচ্চুস সম্পর্কে একই ধরনের গল্প প্রচলিত আছে। তারা বৃষ্টির দেবতা ছিলেন। গ্রীকদের হাতেই ছাতার বিস্তৃতি ঘটে। গ্রীকে দায়ুনিসিয়াসের পূজা হত। উৎসবের সময় দেবতার মাথায় একটা প্যারাসল ধরা হত। শীঘ্রই অন্য দেবতাদের মাথায়ও প্যারাসল ধরা হলো। এরপর এথেন্সের রমনীরাও ছাতা ব্যবহার শুরু করে। মেয়েদের ব্যবহার্য সামগ্রীর ভিতরে ছাতা অপরিহার্য অংশ হয়ে যায়।


আমার জন্মের দুইশো বছর আগে ১৭৮৬ সালে বাটের সাথে শিক লাগানো বৃত্তাকার ছাতার প্যাটেন্ট অর্জন করেন জন বিয়ালে। উনবিংশ শতাব্দীতে এই ছাতার ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটে। বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জেন্টলম্যানেদের হাতে কালো সিল্ক বা সুতোর কাপড়ের ছাতা ফ্যাশানের অংশ হয়ে উঠেছিল।


একবিংশ শতাব্দীর মানুষ আমরা। ছাতা এখনো আমাদের অপরিহার্য অংশ।


  


জুতা আবিষ্কারের ইতিহাস


জুতা বা জুতোর উদ্ভাবন হয়েছিল মূলত মানুষের পা এর নিরাপত্তা বিধানের জন্যে। তবে বর্তমানে এটি আমাদের অপরিহার্য একটি বস্তু হয়ে দাড়িয়েছে। কিন্তু একটা সময় মানুষ জুতা ব্যবহার করতো না বরং তারা খালি পায়ে জীবন যাপন করতো। তবে এই জুতার আবিষ্কার হলো কীভাবে? জুতা ব্যবহারের ইতিহাস খুব বেশী নতুন নয়।


মানুষের চাহিদা ও সময়ের প্রয়োজনে জুতার আবিষ্কার হয়েছে। বর্তমানে জুতা একটি ফ্যাশন। কালের সাথে তাল মিলিয়ে বর্তমানে হরেক রকম জুতা দেখতে পাওয়া যায়। বর্তমানে জুতাকে বিভিন্ন নাম ও ভাষায় ডাকাও হয়। যেমন বলা হয় স্যান্ডেল, চটি, স্যু, চপ্পল, ফুটওয়ার, ফুটকেয়ার ইত্যাদি।



আমাদের সমাজ সভ্যতায় জুতার আগমন কিভাবে ঘটেছে আমরা হয়তো অনেকেই তা জানি না। আসুন আমরা আজকে সে সম্পর্কে জানার চেষ্টা করি। ১৭০০ শতকের দিকে কাঠের তৈরি খড়ম ভারতীয় উপমহাদেশে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। সেই হিসেবে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার কল্পনা মিশিয়ে ‘জুতা আবিষ্কার’ কাহিনী বর্ণনা করেছেন।


তিনি লিখেছেন, ‘পথ হাঁটতে গিয়ে ধুলার অত্যাচারে রাজা হবুচন্দ্র ভীষণ অস্থির। একদিন মন্ত্রী গবুকে ডেকে বললেন, তোমরা এমন এক উপায় বের কর, যাতে হাঁটতে গিয়ে পায়ে আর ধুলা না লাগে। এ কথা শুনে মন্ত্রী, পণ্ডিত সবাই অস্থির।


অবশেষে এক চামারকে ধরে আনা হলো। সে চামড়া দিয়ে রাজার পাদুকা তৈরি করে মন্ত্রী, পণ্ডিতসহ পারিষদবর্গকে রক্ষা করল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার কল্পনা দ্বারা এই কাহিনী বর্ণনা করেছেন তবে জুতা আবিষ্কারের প্রকৃত কাহিনী এটা নয়। জুতার ইতিহাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এই বস্তুটির আবিষ্কারের ইতিহাস অত্যন্ত লম্বা।


প্রায় চল্লিশ হাজার বছর আগেই মানুষ পথ-ঘাট পাড়ি দেওয়ার জন্য জুতার ব্যবহার শুরু করেছিল। তবে প্রথমে কী কারণে জুতা তৈরি হয়েছিল তা এখনো উদ্ধার করতে পারেননি গবেষকরা। পূর্ণাঙ্গ জুতা ব্যবহারের ইতিহাস পাওয়া গেছে বছর খানেক আগে।


জুতার গবেষকরা জানিয়েছেন, ৫ হাজার ৫০০ খ্রিস্টপূর্বে পূর্ণাঙ্গ জুতা তৈরি হয়। আর্মেনিয়ার এরিনিয়া-১ নামক গুহায় ইতিহাসখ্যাত ওই জুতার সন্ধান পাওয়া গেছে। জুতা আবিস্কারের প্রথমে দুই পায়ের জুতা এবং নারী-পুরুষের জুতা একই ধরনেরই ছিল। এই জুতা তৈরি হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ১৬ থেকে ১২ শতকের দিকে।


ধারণা করা হয়, বিশ্বের প্রথম জুতা তৈরি হয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যে। গবেষকদের মধ্যে কেউ কেউ বলেছেন, প্রথম জুতা তৈরি হয় ইরানের সীমান্ত এলাকায়। পাহাড়ে বসবাসকারী মানুষের যাতায়াত সুবিধার জন্য প্রথম জুতা তৈরি করা হয়েছিল। ভারতবর্ষে জুতার ব্যবহার যে প্রাচীনকালেই শুরু হয়েছিল, তার প্রমাণ প্রাচীন সূর্য মূর্তি কিংবা কার্তিকের জুতা পরিধান দেখে বোঝা যায়।


রামায়ণে উল্লেখ আছে যে, দেবতা রামের অনুপস্থিতিতে ভরত যখন সিংহাসনে আসীন হন, তখন বড় ভাইয়ের পাদুকা-যুগল সিংহাসনে রেখেই তিনি রাজ্য পরিচালনা শুরু করেন। যিশু খ্রিস্টের জন্মের বহুকাল আগেই মহাকবি কালিদাসও তার ‘কাদম্বরী’ গ্রন্থে সন্ন্যাসীদের নারিকেলের ছোবড়া দিয়ে তৈরি পাদুকা ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেছেন।


সভ্যতা যত বিকশিত হয়েছে জুতাও তত আধুনিকতা লাভ করেছে। জুতার আধুনিকায়ন শুরু হয় আজ থেকে ৪০০ বছর আগে এবং এ ধারা আজও চলছে। আধুনিকায়নের সময়ে একেক ধরনের কাঠের জুতা তৈরি করে তার নতুন নতুন নামকরণ করা হয়েছিল। পাদুকার প্রথম আধুনিকায়নে হাত দিয়েছিল ইউরোপীয়রা। ক্রমে পৃথিবীর অন্যান্য দেশও এতে অংশগ্রহণ করে।


১৮০০ শতকের দিকে জাপানিরা কাঠ দিয়ে তৈরি করে ‘ওকোবো’ নামে এক ধরনের জুতা, যার পরিমাপ ছিল ১৪ সেন্টিমিটার। সাধারণত বৃষ্টির দিনে কাদা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এ জুতা পায়ে দিত জাপানের নারীরা। জুতাটির ফিতা ছিল লাল। নারী-পুরুষ উভয়ের কথা মাথায় রেখেই ১৭০০ শতকের দিকে ইউরোপীয়রা তৈরি করে এক ধরনের উঁচু জুতা, যা ‘হাই হিল’ নামে পরিচিত ছিল। এ জুতা প্রথম ব্যবহার শুরু করেন ফ্রান্সের সম্রাট পঞ্চদশ লুই।


খ্রিস্টীয় চতুর্দশ থেকে সপ্তদশ শতক পর্যন্ত লেবানিজরা ব্যবহার করত ‘কাবকাবস’ নামে এক ধরনের কাঠের জুতা। মূলত এই জুতাগুলো মধ্যযুগে ব্যবহৃত জুতা দেখে নকশা করা হয়েছিল। এই জুতাগুলো বেশ উঁচু হওয়ার কারণে কাদা-পানি লাগার আশংকা খুবই কম ছিল। বিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ফিনল্যান্ড গাছের ছাল দিয়ে তৈরি করে এক ধরনের জুতা। বৃষ্টি, কাদা এবং বরফ আচ্ছাদিত পথ পাড়ি দেওয়ার জন্যই মূলত এ জুতা তৈরি করা হয়েছিল। পরে নরওয়ে, সুইডেন এবং রাশিয়া এই জুতার আধুনিকায়ন করে।


পঞ্চদশ শতকের শেষদিকে ইতালিও কাঠ দিয়ে তৈরি করে ‘চোপিনস’ নামে এক ধরনের ক্ষুদ্রাকৃতির জুতা। নারীদের ব্যবহারের জন্য এ জুতার পরিমাপ ছিল ৫ ইঞ্চি। ভারতবর্ষে ১৭০০ শতকের দিকে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল কাঠের খড়ম। উনিশ শতকের দিকে ফ্রান্সে একবার কাঠ দিয়ে তৈরি হয়েছিল বিয়ের জুতা। তারা এ জুতার ধারণা পেয়েছিল নবম শতকের দিকে প্রাচীন আফ্রিকার মরিসাসের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের মানুষের ব্যবহৃত জুতা দেখে। ফ্রান্সের পুরুষরা তখন এই বিশেষ বিয়ের জুতা পরে বিয়ে করতে যেত। আজকের দিনে প্রচলিত বাম ও ডান পায়ের জন্য আলাদা জুতা তৈরির ইতিহাস খুব বেশি পুরাতন নয়। ডান ও বাম পায়ের জন্য আলাদা জুতা তৈরি হয়েছে মাত্র এক হাজার ৮৫০ বছর আগে।


বর্তমানে জুতা মানুষের মাঝে ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে ফলে বছর-বছর বিভিন্ন ডিজাইন ও আঙ্গিকে জুতা আসছে বাজারে। বর্তমানে বিশ্বে অনেক নামী-দামী জুতার কোম্পানি আছে। তারা জুতাকে দিন-দিন আরও বেশী আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও পার্বণে জুতা এখন মানুষের নিত্য সঙ্গী।


 


 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Pages

SoraTemplates

Best Free and Premium Blogger Templates Provider.

Buy This Template