মার্কনি নয়, রেডিওর আবিষ্কারক জগদীশচন্দ্র বসু?
ছেলেটির ঘোড়ায় চড়ার শখ ছিল। কিন্তু ওই বয়সে ঘোড়ায় চড়া সম্ভব ছিল না বিধায় বাবা তাকে টাট্টুঘোড়া কিনে দিলেন। ঘোড়া পেয়ে ছেলেটি বেজায় খুশি!
ছেলেটি একদিন শুনতে পেল শহরে ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা হচ্ছে। শুনে ছেলেটিও টাট্টুঘোড়া নিয়ে মাঠে উপস্থিত হলো। ইয়া বড় বড় সব ঘোড়া এসেছে প্রতিযোগিতায়। পাকা পাকা সব ঘোড় সওয়ার। তার মধ্যে পুচকে এক ছোকরাকে টাট্টুঘোড়া নিয়ে উপস্থিত(present) হতে দেখে একজন বলেই ফেলল, এই যে খোকা, তুমিও পাল্লা দেবে নাকি? তবে ছোটাও তোমার টাট্টু।
ছেলেটি মনে মনে এমনটিই চাইছিল। প্রতিযোগিতা শুরু হতেই সেও টাট্টুঘোড়া নিয়ে ছুটতে শুরু করল। তার উৎসাহ দেখে কে! তবে পাল্লা দিয়ে সে বড়দের সঙ্গে পেরে উঠল না। সবার পেছনে রইল সে। পড়ে গিয়ে শরীরের নানা জায়গায় রক্তপাতও হলো। কিন্তু হাল ছাড়ল না। দৃঢ় মনোবল নিয়ে বড়দের মতো ঘোড়া ছুটিয়ে পুরো মাঠ ঘুড়ে তবেই ছেলেটি ক্ষান্ত হলো।
এখানে যে ছেলেটির কথা বলা হলো, সে আর কেউ নয়, সে এই বাংলার জগৎখ্যাত বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু। তার পিতা ভগবানচন্দ্র বসু, মা বামা সুন্দরী দেবী। আদি নিবাস বিক্রমপুরের রাড়িখাল। জগদীশের বয়স যখন ৯ বছর, তখন ইংরেজি শিক্ষার জন্য তাকে কলকাতার হেয়ার স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু পল্লীগ্রাম থেকে শহরে গিয়ে তাকে বেশ অসুবিধায় পড়তে হলো। শহরের ছেলেরা তার কথা শুনে ঠাট্টা-তামাশা করতে শুরু করল।
একদিন সহ্য করতে না পেরে জগদীশচন্দ্র এক সহপাঠীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। কিল, চড়, ঘুষি মেরে সহপাঠীকে এমন নাস্তানাবুদ করলেন যে, সবাই বুঝে গেল গ্রাম থেকে আসা ছেলেটি দেখতে তালপাতার সেপাই হলে কী হবে শরীরে শক্তি এবং মনে সাহস আছে। এ ঘটনার পর থেকে কেউ আর তাকে নিয়ে ঠাট্টা করত না।
জগদীশচন্দ্র বসু ১৬ বছর বয়সে প্রথম বিভাগে প্রবেশিকা পাস করে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ভর্তি হন। ১৮৮০ সালে গ্র্যাজুয়েট হন। এরপর কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি এবং লন্ডন ইউনিভার্সিটি থেকে উচ্চশিক্ষা শেষ করে দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে ১৮৮৫ সালে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে পদার্থ বিদ্যার অধ্যাপক হন। কিন্তু বিধিবাম! চাকরি নিলেন ঠিকই কিন্তু বেতন নিলেন না। তোমরা ভাবছ এ আবার কেমন চাকরি! আসল ঘটনা হলো, তখন ভারতীয় এবং ইংরেজদের বেতনের বৈষম্য ছিল। তিনি সেই বৈষম্য মানলেন না। প্রতিবাদ করে বিনা বেতনেই ছাত্র পড়াতে লাগলেন। পরে অবশ্য কর্তৃপক্ষ তাদের ভুল বুঝতে পেরেছিল। এমনই ছিল জগদীশচন্দ্র বসুর মনের জোর।
তোমরা তাকে মস্তবড় বিজ্ঞানী হিসেবে জানো। তার গবেষণার প্রধান বিষয় ছিল উদ্ভিদ ও তড়িৎ চৌম্বক। আমরা অনেকেই বলি, জগদীশচন্দ্র বসু গাছের প্রাণ আছে এটি আবিষ্কার করেন। কথাটি পুরোপুরি সঠিক নয়। কারণ বহু বছর আগে থেকেই বিজ্ঞানীরা এ ব্যাপারে প্রায় নিশ্চিত ছিলেন। জগদীশচন্দ্র বসু যেটি করেছেন তা হলো, তিনি উদ্ভিদ কীভাবে বেড়ে ওঠে সেই যন্ত্র ক্রেস্কোগ্রাফ এবং উদ্ভিদের দেহের উত্তেজনার বেগ নিরুপক যন্ত্র রিজোনাস্ট রেকর্ডার আবিষ্কার করেছিলেন। এই যন্ত্রের সাহায্যে তিনি উদ্ভিদের অনুভূতি, বৃদ্ধি ইত্যাদি বস্তুনিষ্ঠভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
ইজিপ্ট কে কেন বাংলায় মিশর বলা হয়
উদ্ভিদ নিয়ে গবেষণা করে তিনি এতটাই সাফল্য অর্জন করেছিলেন যে পৃথিবীব্যাপী তার সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। ভারতীয়রাও বিজ্ঞান গবেষণার ক্ষেত্রে নিউটন-আইনস্টাইনের চেয়ে কম নন- একথা তিনিই প্রথম বিশ্ববাসীকে স্মরণ করিয়ে দেন। তার সম্পর্কে আইজ্যাক আইনস্টাইন বলেছেন : ‘জগদীশচন্দ্র যেসব অমূল্য তথ্য পৃথিবীকে উপহার দিয়েছেন তার যে কোনটির জন্য বিজয়স্তম্ভ স্থাপন করা উচিত।’
জীবনের এক পর্যায়ে জগদীশচন্দ্র বসু ক্ষুদ্র দৈর্ঘ্যের তরঙ্গ নিয়ে গবেষণা করতে শুরু করেন। এটি মাইক্রোওয়েভ নামে পরিচিত। তোমরা যে টেলিভিশন দেখ, রাডার যন্ত্রের কথা শোন সেগুলো এই মাইক্রোওয়েভ তরঙ্গে কাজ করে। যাই হোক, ১৮৯৪ সালে জগদীশচন্দ্র কলকাতায় প্রথম বিনা তারে বার্তা প্রেরণ এবং তা গ্রহণ করার কৌশল দেখিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন। মানবসভ্যতার ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা এটাই প্রথম। পরবর্তীতে তার এই আবিষ্কার প্রদর্শনের জন্য তিনি ইংল্যান্ড যান। ১৮৯৬ সালের ২৪ জুলাই লন্ডনে বিজ্ঞান সমিতিতে তিনি তার আবিষ্কার উপস্থিত অন্যান্য বিজ্ঞানীর সামনে তুলে ধরেন। এ সময় তিনি ভীষণ প্রশংসিত হন।
কিন্তু ভাববার বিষয় হলো লন্ডন থেকে দেশে ফেরার পর জগদীশচন্দ্র বসু মাইক্রোতরঙ্গ নিয়ে আর কাজ করেননি। কারণ তিনি তখন উদ্ভিদ নিয়ে মেতে ওঠেন। আর ওদিকে বিজ্ঞানী মার্কনি এ সময় রেডিও আবিষ্কার করেন। অনেকে বলেন মার্কনি এই ধারণা জগদীশ চন্দ্রের গবেষণা থেকেই পেয়েছিলেন। যদিও জগদীশচন্দ্র তার সেই আবিষ্কার নিজের নামে পেটেন্ট করে রাখেননি। ফলে এ নিয়ে বিতর্কটা রয়ৈই গেল। তবে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, জগদীশচন্দ্র বসু কাজ করেছেন মাইক্রোতরঙ্গ নিয়ে এবং রেডিও যন্ত্রের উদ্ভাবক মার্কনি কাজ করেছেন বেতার তরঙ্গ নিয়ে। তারপরও বর্তমানে, বিশ্বের তাবত বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুকেই বিনা তারে বার্তা প্রেরণের জনক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
জগদীশচন্দ্র বসু ১৯২৭ সালে কলকাতায় একটি বিজ্ঞান গবেষণাকেন্দ্র স্থাপন করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এটিকে তিনি ‘মন্দির’ হিসেবে উল্লেখ করেন। বর্তমানে এটি ‘বসু বিজ্ঞান মন্দির’ নামেই বেশি পরিচিত। তোমাদের একটি মজার তথ্য দেই। জগদীশচন্দ্র বসু এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। এখন তোমরা যদি বলো, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তো শিশুকিশোরদের জন্য কত কিছু লিখেছেন, জগদীশচন্দ্র বসু লেখেননি? হ্যাঁ, তিনিও তোমাদের জন্য ‘অব্যক্ত’ নামে মজার একটা বিজ্ঞান বিষয়ক বই লিখেছিলেন। তোমরা চাইলে এখনও সেটা পড়তে পারো।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন